কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি

বাংলাদেশে অধিক বেকার সমস্যা থাকার কারণে বাংলাদেশে বাড়ছে খামারিদের সংখ্যা। বিভিন্ন রকম খামার রয়েছে বাংলাদেশে পশুপাখি, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি খামার করে থাকে বাংলাদেশের মানুষ। 

কিন্তু আজকে এই লেখায় কথা বলব একটু ভিন্ন বিষয় নিয়ে তাহলো কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালন পদ্ধতি নিয়ে। কেননা বাংলাদেশের বিভিন্ন রকম খামার করার সাথে সাথে এবং বিভিন্ন পশু পাখি পালন করার সাথে সাথে বাড়ছে কোয়েল পাখি পালনের চাহিদা। 

আরও পড়ুন

শিং মাছ চাষ পদ্ধতি

লিচু গাছে কলম করার পদ্ধতি

দেশি গরুর খামার


তাই আজ এই লেখায় কথা বলবো কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি নিয়ে। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি এবং আমাদের সাথে থাকুন।

 

কোয়েল পাখি (koel pakhi)পরিচিতি:


কোয়েল পাখির (koel pakhi) উৎপত্তি হয় সাধারণত জাপানে। এবং কোয়েল পাখি দীর্ঘদিন ধরে জাপান, মালয়শিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ আরো বিভিন্ন দেশে এই কোয়েল পাখি পালন করা হচ্ছে। এবং এটি বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এখন কমবেশি পালন করা হয়। 
কেননা কোয়েল পাখির মাংস এবং ডিম অতি সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। এছাড়া এই কোয়েল পাখি সাধারণত ৯০ দশকের শুরুর দিকে ভারত থেকে প্রথম বাংলাদেশে আনা হয়। কোয়েল পাখির সাধারণত আকারে ছোট এবং এটি সাধারণত গৃহপালিত পাখি। 
এছাড়া কোয়েল পাখির জন্মস্থান সাধারণত জাপান হলেও বাংলাদেশেও কোয়েল পাখি পালন করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। 

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালন করার সুবিধা:

 
কোয়েল পাখি পালন করার অধিক সুবিধা রয়েছে। কেননা বাংলাদেশের সাধারণত হাঁস মুরগির খামার করা হয় এবং এগুলো সাধারণত পারিবারিকভাবে পালন করা যায়। 
কিন্তু কোয়েল পাখি পালন করার জন্য রয়েছে অত্যাধিক সুবিধা। কেননা কোয়েল পাখি সাধারণত বিভিন্ন উপায়ে পালন করা হয়

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালনের বিভিন্ন উপায়:

 
কোয়েল পাখি পালন করা হয় সাধারণত 

  • পারিবারিকভাবে 
  • খাচায় বদ্ধ করে 
  • খামার হিসেবে 
  • লিটার পদ্ধতি
 
পারিবারিকভাবেও পালন করা যায় এবং খাচায় বদ্ধ করে পালন করা যায় এছাড়া কোয়েল পাখি খামারেও পালন করা হয়। 

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালনের কিছু সুবিধা সমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:


  • অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ 
  • এর মাংস ও ডিম অতি সুস্বাদু 
  • এবং পুষ্টিকর 
  • খাদ্য কম লাগে
  • কম জায়গায় বেশি পাখি পালন করা যায় 
  • দ্রুত বৃদ্ধি
  • অল্প সময়ে ডিম দেয়
  • বাজারে চাহিদা বেশি 
  • দামও বেশি 
 
কোয়েল পাখির মাংস সাধারণত অতি পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু। এছাড়া ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সে এটি খাওয়ার উপযোগী হয়। এবং ওজন হয় সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম এছাড়া উৎপাদন খরচ এবং বাজারে চাহিদা বেশি। 
একজোড়া কোয়েল পাখির দাম সাধারণত ৮০ থেকে ৯০ টাকা। এবং এটি পালন করা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। এছাড়া ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সে এটি ডিম দেয়। 

কোয়েল পাখির (koel pakhi) বিভিন্ন প্রজাতি :


বিভিন্ন জাতি এবং প্রজাতির কোয়েল পাখি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো জাপানিজ। (Japanese white) হোয়াইট কোয়েল পাখি (koel pakhi) । 
এছাড়া সারা পৃথিবীতে ১৬ প্রজাতির কোয়েল পাখি রয়েছে।এবং এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে জাতগুলো তা হচ্ছে ডিম উৎপাদনকারী কোয়েলের মাঝে আছে।
 
  • ফারাও (farao) 
  • ব্রিটিশ রেঞ্জ (british range) 
  • ইংলিশ হোয়াইট (english white)
  • ম্যানচুরিয়াল গোল্ডেন (american) 
  • হোয়াইট বেস্ট কোয়েল (indian)

এধরনের সকল প্রজাতির কোয়েল পাখি সাধারণত বাংলাদেশে পালন করা হয়ে থাকে
 

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালনের উপযুক্ত জায়গা সমূহ: 


কোয়েল পাখির সাধারণত বিভিন্ন ভাবে পালন করা যায় এর জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গার প্রয়োজন নেই। তবে বেশি কোয়েল পাখি একসঙ্গে পালন করার জন্য অবশ্যই জায়গা নির্বাচন করতে হবে। 
কোয়েল পাখি সাধারণত বিভিন্ন উপায়ে পালন করা যায়। কারণ পারিবারিক ভাবে পালন করতে হলে সাধারণত হাঁস মুরগি কিভাবে পালন করা হয়। এভাবেই পালন করা যাবে বরং হাঁস মুরগি পালন করা হয় একই জায়গায় অধিকসংখ্যক কোয়েল পাখি পালন করা সম্ভব। 
এছাড়া খাঁচায় আবদ্ধ ভাবেও কোয়েল পাখি পালন করা সম্ভব। যেভাবে খাঁচায় কবুতর পালন করা হয় এবং অন্যান্য পাখি পালন করা হয় ঠিক একইভাবে খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন করা যায়। কোয়েল পাখি খাচায় পালন করতে হলে সে ক্ষেত্রে সাধারণত ৭৫ থেকে ১০০ বর্গ সেন্টিমিটার জায়গার প্রয়োজন হবে। 
এছাড়াও যদি বয়স্ক কোয়েল পাখি পালন করতে চান সে ক্ষেত্রে ১৫০ বর্গ সেন্টিমিটার জায়গার প্রয়োজন হয়। এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন খাঁচায় সঠিক পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।খাঁচা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে যেমন প্লাস্টিকের খাঁচা এবং লোহার খাঁচা তবে প্লাস্টিকের খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন করা সহজ। 
এছাড়া খাচায় পালন করতে হলে সাধারণত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা অনবরত রাখতে হবে। এবং খাদ্য সবসময় দিয়ে রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে খাঁচা তিন থেকে চারটি স্তরে বিভক্ত করা যেতে পারে। 
এবং খাঁচার নিচের যে স্তর থাকে যেখানে থাকবে তাদের পায়ের নিচে সাধারণত নরম জায়গা থাকলে ভালো হয়। সেক্ষেত্রে কাঠের গুড়া ধানের তুষ এগুলো দিলে সাধারণত জায়গা ভালো থাকে। 
এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন ভেজা না থাকে। এবং খাচায় পালন করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে কোয়েল পাখি সাধারণত তিনটি স্ত্রী কোয়েল পাখির সাথে একটি পুরুষ কোয়েল পাখি (adjust) করতে পারে।

খামারে কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালন:


অনেক বড় জায়গা সাধারণত নেট দিয়ে কিংবা কাঁটাতার দিয়ে চারপাশে বেড়া দিয়ে ভিতরে কোয়েল পাখি পালন করা সম্ভব। কবুতর পালনের মতো এবং সেই নেটের ভিতর কোয়েল পাখি অনেক গুলো একসাথে পালন করা সম্ভব। 
সেক্ষেত্রে ভিতরে জায়গায় যেমন পাখির বাসা থাকে সেভাবে কোয়েল পাখি বসার জন্য বা ডিম প্রদান করার জন্য সেভাবে জায়গা নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া আরও বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে কোয়েল পাখি পালন করার জন্য। 

লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালন:


লিটার পদ্ধতি বলতে কোন মেঝের উপরে ধানের গুড়া, কিংবা বালু অথবা কাঠের ঘুন। এগুলো সাধারণত পাঁচ থেকে সাত ইঞ্চি পুর করে মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া হয় এটাকে বলে লিটার পদ্ধতি। কোয়েল পালন পদ্ধতির মধ্যে লিটার পদ্ধতি সাধারণত অধিক ব্যয়বহুল। 

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালনের জন্য খাদ্য:



কোয়েল পাখি পালনের পদ্ধতি গুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাদ্য। কেননা খাদ্য ছাড়া কোয়েল পাখি পালন সম্ভব নয়। কোয়েল পাখির জন্য সাধারণত সেরকম খাদ্যের প্রয়োজন হয় না কারণ কোয়েল পাখি আকারে ছোট এবং এদের খাদ্য চাহিদাও কম।
 
কোয়েল পাখির খাদ্যের মধ্যে সাধারণত যে সকল খাদ্য খায় তা নিয়ে আলোচনা করা হলো। 

  • গম ভাঙ্গা 
  • ভুট্টা 
  • চালের গুঁড়া 
  • শুকনা মাছের গুড়া 
  • তিলের খৈল 
  • সোয়াবিন 
  • ঝিনুকের গুড়া ও 
  • লবণ

ইত্যাদি খাদ্য সাধারনত কোয়েল পালনে সরবরাহ করতে হবে।

খাদ্য প্রদান:


কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতিতে খাদ্য প্রদান সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা খাদ্য দিতে হবে পরিমিতভাবে কোয়েল পাখিকে নিয়মিত খাদ্য প্রদান করতে হবে। এবং ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়েলকে দিনে ৪ বার বা তার অধিক খাদ্য প্রদান করতে হবে।
 এছাড়াও পঞ্চম সপ্তাহ থেকে দৈনিক প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ গ্রাম খাদ্য দেওয়া প্রয়োজন। এবং কোয়েল পাখির খাদ্য লাগে বছরে ৮ কেজি। এটা সাধারণত কোয়েল পাখির খাদ্যের হার। 

কোয়েল পাখির (koel pakhi) রোগ বালাই:


কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় তা হচ্ছে কোয়েল পাখির রোগ বালাই। রোগবালাই সম্পর্কে না জানলে কোয়েল পাখি পালনে উন্নত করতে পারবে না। এজন্য আমাদের জানতে হবে যে কোয়েল পাখির রোগ বালাই গুলো কি? এবং তাতে করনীয় কি? 
কোয়েল পাখি তা সাধারণত তেমন রোগ বালাই হয় না। কোয়েল পাখির সাধারণত কিছু রোগে আক্রান্ত হয় তা হচ্ছে রক্ত আমাশয় এবং রানীক্ষেত রোগ। এবং এদের প্রতিকার করার ক্ষমতা রয়েছে। 
এছাড়া কোয়েল পাখি সাধারণত সংক্রামক দ্বারা রোগে আক্রান্ত হয় এবং এদেরকে সাধারণত ২০০ মিলিমিটার প্রপিয়নিক এসিড মিশ্রিত করলে ছত্রাকের সাধারণত মুক্তি মেলে।
 

কোয়েল পাখির (koel pakhi) ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন:


কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতিতে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন অনধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোয়েল পাখির বাচ্চা ফুটাতে হলে সাধারণত তিনটি স্ত্রী কোয়েল পাখির সঙ্গে একটি পুরুষ কোয়েল পাখির (adjust) করতে হবে। 
এবং কোয়েল পাখি কখনো কুজো হয় না। যার কারণে মুরগির নিচে বা যেকোন ইনকিউবেটরে(incubator) ডিম ফোটানো সম্ভব। এছাড়া ১৫ থেকে ১৮ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।বাচ্চা ফুটানোর সময় ডিম উৎপাদনের জন্য ঘরে সাধারণত ১৬ ঘন্টা আলো বাতাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। 
এবং পূর্ণবয়স্ক থেকে বেশি পেতে হলে সাধারণত পাঁচ সপ্তাহ বয়সে ১২ ঘণ্টা এবং ষষ্ঠ সপ্তাহে ১৩ ঘণ্টা এভাবে আলো প্রদান করতে হবে। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য সাধারণত ৬০ ওয়াটের একটি বাল্ব ই যথেষ্ট।

কোয়েল পাখির (koel pakhi) চিকিৎসা:


কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি তে চিকিৎসার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কেননা পশুপাখির রোগবালাই হতেই পারে সেক্ষেত্রে চিকিৎসা অন্যতম। সে ক্ষেত্রে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে কোয়েল পাখিকে। 
কারণ অতি গরমের সময় ঠাণ্ডা এবং শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে এবং অধিক ঠান্ডার সময় একটু গরম প্রদান করতে হবে। সেক্ষেত্রে কোয়েল পাখির জন্য স্যালাইন (saline) প্রদান করা যেতে পারে খাবার স্যালাইন। এবং বেশি পরিমাণে কোন রোগ বালাই দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। 

কোয়েল পাখি (koel pakhi) পালনে প্রশিক্ষণ:


যদি কেউ প্রকৃতভাবে অর্থাৎ খামার করতে চান কোয়েল পাখি পালনের। তাহলে সে ক্ষেত্রে আমি বলব প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। কেননা বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পাখি পালন করতে হলে অবশ্যই প্রশিক্ষণ জানতে হবে। 
সে ক্ষেত্রে আপনি করতে পারেন আপনার নিকটস্থ কোন প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর যদি থাকে। কিংবা প্রতিটি উপজেলা ভিত্তিক এবং জেলা ভিত্তিক যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে চাইলে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। হয়তো নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি ধরা হবে। 

এই হল কোয়েল পাখি পালনের সাধারণত পদ্ধতি। এবং উপরোক্ত বিষয়গুলো মেনে চললে কোয়েল পাখি পালনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হবে না। কেননা উপরিউক্ত লেখায় কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি নিয়ে সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 
এবং প্রায়ই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে যে কোয়েল পাখি পালনের পদ্ধতি গুলো কি এবং কোয়েল পাখি কিভাবে পালন করতে হয়। আশা করি এসকল বিষয় নিয়ে আর প্রশ্ন আসবে না। কারণ উপরিউক্ত লেখায় কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ